লিফট আধুনিক জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। বহুতল ভবন, শপিং মল, হাসপাতাল এবং আবাসিক কমপ্লেক্সে লিফট আমাদের সময় বাঁচায় এবং যাতায়াত সহজ করে। তবে এই সুবিধার সঙ্গে রয়েছে বিপদ। বাংলাদেশে বিশেষ করে হাতিরঝিল, ধানমন্ডি, বনানীসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে লিফট দুর্ঘটনার ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রাপ্তবয়স্ক সবাই কখনো না কখনো এর শিকার হচ্ছেন। লিফট দুর্ঘটনা প্রায়ই অল্প সচেতনতা বা সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের কারণে ঘটে। এই লেখায় আমরা লিফট দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিকার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত আলোচনা করব।

লিফট দুর্ঘটনার প্রধান কারণ

১. রক্ষণাবেক্ষণের অভাব:
লিফটের যান্ত্রিক অংশ, দরজা, কেবিন ও ফাঁকের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। বোতাম, সেন্সর বা মোটরের সমস্যা থাকলে লিফট হঠাৎ বন্ধ বা উল্টোভাবে চলতে পারে।

২. অতিসচেতন বা অবহেলিত ব্যবহার:
অনেকে লিফট ব্যবহারের সময় নিয়ম না মেনে ঝুঁকি নিয়ে থাকেন। দরজা বন্ধ হওয়ার আগে প্রবেশ বা বের হওয়া, লিফটের ফাঁক দিয়ে হাত বা পা ঢোকানো, লাফানো বা দৌড়ানো প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।

৩. সেন্সরের ত্রুটি:
আজকাল অধিকাংশ লিফটে দরজা সেন্সর থাকে, যা বাধা অনুভব করলে লিফট বন্ধ বা স্থগিত রাখে। তবে এই সেন্সর ঠিকভাবে কাজ না করলে শিশুর হাত, পা বা কাপড়ের ফাঁকে আটকিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

৪. সর্বনিম্ন বা অতিরিক্ত ওজন বোঝা:
লিফটের ওজন সীমা অতিক্রম করলে তা হঠাৎ থেমে যেতে পারে বা যান্ত্রিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো লিফট অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে গিয়ে দরজা খোলা অবস্থায় লিফট নেমে যায়।

৫. অতিরিক্ত ভিড়:
শপিং মল বা আবাসিক কমপ্লেক্সে ভিড়ের কারণে মানুষ হঠাৎ লিফটে ঢোকে বা দরজা বন্ধ হওয়ার সময় ফাঁকে পড়ে।

৬. অভিজ্ঞতার অভাব:
শিশু ও বয়স্করা অনেক সময় লিফট ব্যবহার করতে পারদর্শী নয়। বোতাম চাপা, দরজা খোলা-বন্ধ করা, লিফটের চলাচল বোঝা—এই অভিজ্ঞতার অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

লিফট দুর্ঘটনার প্রতিকার

১. নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ:
লিফট ব্যবহারের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হলো নিয়মিত সার্ভিস। দরজা, সেন্সর, মোটর, কেবিন, ফাঁক—সকল যান্ত্রিক অংশের নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে পুরনো লিফটের ক্ষেত্রে এই রক্ষণাবেক্ষণ অবশ্যক।

২. নিরাপত্তা নির্দেশিকা মানা:
লিফট ব্যবহার করার সময় দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রবেশ বা বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। শিশুদের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক থাকা এবং লিফটে দৌড়ানো বা খেলাধুলা না করার নির্দেশ দেওয়া আবশ্যক।

৩. সেন্সর সঠিকভাবে পরীক্ষা করা:
লিফটের দরজা সেন্সরের কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সেন্সর ত্রুটিপূর্ণ থাকলে তা অবিলম্বে মেরামত করা উচিত।

৪. ওজন সীমা মেনে চলা:
লিফটে নির্ধারিত ওজন সীমার বাইরে মানুষ বা মালামাল বহন করা উচিত নয়। বোঝা অতিরিক্ত হলে লিফটের চলাচল বিপজ্জনক হয়ে যায়।

৫. শিশুদের সচেতন করা:
শিশুদের লিফটের ব্যবহার, বিপদ ও নিরাপত্তা নিয়ম সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া জরুরি। পরিবারের বড়রা যদি উদাহরণ দেখান, শিশুদের শেখার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়।

৬. প্রযুক্তির ব্যবহার:
আজকাল আধুনিক লিফটে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, যেমন জরুরি থামানো বোতাম, অতিরিক্ত ওজন শনাক্তকরণ, দরজা বন্ধ হওয়ার সেন্সর। এগুলো ব্যবহার এবং পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

৭. জরুরি ব্যবস্থার প্রস্তুতি:
লিফটের মধ্যে আটকে যাওয়া বা দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। জরুরি ফোন, বেল, আলার্ম এবং দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ দল থাকা চাই।

সচেতন ব্যবহারই মূল প্রতিকার

লিফট দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতন ব্যবহার। প্রাপ্তবয়স্করা যদি নিরাপদ ব্যবহার দেখান, শিশু ও অন্যান্য ব্যবহারকারীরাও তা অনুকরণ করবে। দরজা বন্ধ হওয়ার আগে লিফটে প্রবেশ বা বের হওয়া থেকে বিরত থাকা, লিফটে দৌড়ানো ও খেলাধুলা না করা, সেন্সর পরীক্ষা করা—সবই ব্যক্তিগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

শেষ কথা 

লিফট আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, তবে এর সঙ্গে বিপদও আছে। হাতিরঝিলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনা আমাদের সতর্ক করে। রক্ষণাবেক্ষণ, সচেতন ব্যবহার, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং শিশুদের শিক্ষা—এই চারটি মূল ভিত্তি মানলে লিফট দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। নিরাপত্তা অবহেলা করলে ছোটখাট ভুলও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই, লিফট ব্যবহারে নিয়ম মেনে চলা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক দায়িত্বও বটে।